সিরাজগঞ্জের সিনেমা হলগুলির অন্তিম দশা ও শংকর সিং এর অলস জীবন, আমাদের দীর্ঘশ্বাস

সিরাজগঞ্জের সিনেমা হলগুলির অন্তিম দশা ও শংকর সিং এর অলস জীবন, আমাদের দীর্ঘশ্বাস

ডাঃ জহুরুল হক রাজাঃ



সিরাজগঞ্জ শহরে একসময় যেমন চারটি রেলস্টেশন ছিল, চারটি সিনেমা হলও ছিল। সেই নির্বাক যুগের আমল থেকেই  প্রধান বিনোদনকেন্দ্র ছিল এই সিনেমা হলগুলি।শুধু শহরের মানুষ নয়,সারা জেলার, সকল স্তরের, সকল ধর্মের মানুষই এই হলে ছবি দেখতে আসতো। 
প্রথমে চলচ্চিত্রে কথা হত না, সংলাপগুলি ছবির নীচে লিখে দেওয়া হত।ছবি দেখতে সময়ও লাগতো অনেক। সন্ধ্যায় শুরু হয়ে শেষ হত পরদিন ভোরে। এসবেরই জীবন্ত স্বাক্ষী শংকর শিং। 

গত শতাব্দীর ত্রিশ দশকের মাঝামাঝি সবাক ছবি (Talki)  শুরু হলেও চল্লিশ দশকেরও বেশ কয়েক বছর চলেছে নির্বাক ছবি। সিরাজগঞ্জে শেষ নির্বাক ছবি ছিল দাতা হাতেম তাই। সে সময় হলিউডের অনেক নির্বাক চলচ্চিত্রও সিরাজগঞ্জ আসতো বলে শংকর শিং জানালেন।

শংকর শিং এর বয়স পচাশি / ছিয়াশি, তার ষাট বছর জীবন ই কেটেছে এই সিনেমা হলে।সিনেমা হলে চাকরি জীবিকা মাধ্যমও যেমন ছিল, তেমন ভালবাসাও ছিলো এই সিনেমা হল।১৯৪৪ সন থেকে শংকর শিং সিনেমা হলে চাকরি নেন,চাকরি শেষ হয় ২০০৪ সালে, সিরাজগঞ্জের লক্ষী সিনেমা হল বন্ধ হয়ে যাবার সাথে সাথে।এখন অলস সময় কাটে লক্ষী সিনেমা হলেরই সামনে দুলাল দার মিলন মাইক সার্ভিস এ বসে বসে, দুলাল দার ফাই ফরমাস পালন করে। ছেলে মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে, ছেলেও ছোট খাটো একটা চাকরি করে, সংসারের সমস্যা নাই। তবু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বার বার বন্ধ লক্ষী হলের দিকে চেয়ে চেয়ে। 

আমাদেরও ভালো লাগে না বন্ধ সিনেমা হলগুলি দেখে। 

সিরাজগঞ্জ শহরে সিনেমা হল চালু হয়েছিল গত শতকের ত্রিশ দশকেই।প্রথম হলের নাম ছিল  চিত্রালী। ভাঙ্গুড়ার এক ভদ্রলোক নাট্য  ভবন ভাড়া নিয়ে চিত্রালী চালু করেন। 
এখন যেটি ভাসানী পৌরমিলনায়তন তারই আদি নাম নাট্য ভবন। এটি নির্মাণ করেছিলেন সিরাজগঞ্জের কৃতি সন্তান ভারতীয় উপমহাদেশের গনিত সম্রাট যাদব চন্দ্র চক্রবর্তী। 

নির্মানের পর নিয়মিত নাট্য প্রদর্শনী হত এখানে। স্বয়ং যাদব বাবু নিজে মন্চে অভিনয় করতেন, তার ছেলেরাও করতেন। তার মৃত্যুর পরে ছেলেরা কোলকাতায়ই স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন, সেই সময় নাট্য ভবনটিও ভাড়া দিয়ে দেন। চালু হয় চিত্রালী। 

চিত্রালীর পরে নির্মিত হয় লক্ষী সিনেমা হল, চল্লিশ দশকের প্রথম দিকেই। মালিক  ছিলেন মারোয়ারী সম্প্রদায়ের এক বিশিষ্ট ব্যাবসায়ী মানিক চাদ সাররাহ।এরপর একজন মুসলমান ব্যাবসায়ী মমতাজ উদ্দীন নির্মাণ করেন মমতাজ হল,পন্চাশ দশকে।মমতাজ সাহেবের ছেলেরা পরে নির্মান করেন গোধূলি সিনেমা হল। 


বাংলাদেশ হবার পর সিরাজগঞ্জ এর আরেকজন বিশিষ্ট ব্যাবসায়ী আবুল হোসেন নির্মাণ করেন মৌসুমি সিনেমা হল, শহরের দক্ষিণ প্রান্তে। এর পর মমতাজ সিনেমা হলের একজন সাবেক কর্মচারী জুড়ান আলী মমতাজ সিনেমা হলের পাশেই নির্মাণ করেন নীলা সিনেমা হল। 
সত্তুর / আশির দশকে সিনেমা ব্যবসা রমরমা হয়ে ওঠে, প্রায় উপজেলায়ই একাধিক সিনেমা হল চালু হয়।

একুশ শতকের প্রথম থেকেই সিনেমা ব্যাবসায় ধ্বস নামা শুরু হয়। নীলা সিনেমা হল আগেই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ২০০৪ সনে বন্ধ হয় লক্ষী সিনেমা হল। তারপরও মমতাজ হল চলছিল, কিন্তু করোনা আসার পর সরকারি আদেশেই বন্ধ হয়ে যায় সিনেমা হলগুলি।বন্ধ হয়ে যায় সিরাজগঞ্জ শহরের সবগুলো সিনেমা হল। এখন আর সিনেমা হলগুলি বাইরে থেকে চেনা যায় না। 

তারপরও শংকর শিং এর সময় কাটে লক্ষী সিনেমা হলের সামনে মিলন মাইক সার্ভিস এ। মমতাজ সিনেমা হলের মালিক ইমতাজ আলী কুমকুম এখনো মমতাজ সিনেমা হলের অফিস রুমে নিয়মিত এসে বসে থাকেন। আমরা  পন্চাশ, ষাট,সত্তুর দশকের সিনেমা পাগল মানুষগুলি এখনো  চেয়ে থাকি লক্ষী,মমতাজ, মৌসুমি, গোধূলি সিনেমা হলের দিকে। 

আবার কি হলগুলির কলাপসিবল গেটগুলি খুলে যাবে? 
আবার কি হলগুলির বড় পর্দাগুলিতে ভেসে  উঠবে নায়ক নায়িকাদের হাসি কান্না, নাচ গান?
আবার কি সিনেমাহল সংলগ্ন দেয়ালে বড় বড় করে নায়ক নায়িকা ভিলেনদের ছবি আকা শুরু করবেন নগেন রায়ের কোন উত্তরসূরি?

আবার শুক্রবার সকালে সপ্তাহের নতুন ছবির পোষ্টার নিয়ে বেরুবে ব্যান্ড পার্টি? 
আবার কি ব্যান্ড পার্টির সঙ্গে সঙ্গে রাজকীয় হালে সিনেমার প্যাম্পলেট নিয়ে শহর প্রদক্ষিণ করবেন শংকর শিং? 

আবারও শংকর শিং এর পিছে পিছে ছুটবে কি ছেলের দল,একটি প্যাম্পলেটের আশায়? 
আবার কি ঘরের কিশোরী, মহিলারা কি জানালার ফাঁক দেখতে দাড়িয়ে থাকবেন, এ সপ্তাহে কি সিনেমা দেখানো হবে সিনেমা হলের রঙিন পর্দায়? 
সেদিন কি আর ফিরে আসবে? 

পচাশি বছরের শংকর শিং আশায় আশায় বসে থাকেন এখনো, ইলিয়ট ব্রিজের ওঠার পথে, মিলন মাইক এ বসে, লক্ষী সিনেমা হলের দিকে তাকিয়ে।