৭ বছর বাঘাবাড়ী নৌ-বন্দরের ইজারা বন্ধ: সরকার হারাচ্ছে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব!

৭ বছর বাঘাবাড়ী নৌ-বন্দরের ইজারা বন্ধ: সরকার হারাচ্ছে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব!

ভুতুড়ে ক্ষতিপূরণ মামলার অন্তরালে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে অবস্থিত উত্তরাঞ্চলের একমাত্র বাঘাবাড়ি নৌ- বন্দরের ৭ বছর ধরে প্রকৃত বাজার মূল্যে বার্ষিক ইজারা প্রদান বন্ধ থাকায় প্রতি বছর সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে কোটি কোটি টাকা। ভ‚তুরে মামলা এবং হাইকোর্টের রিট জণিত জটিলতার কারণে কর্তৃপক্ষ এ বন্দরের ইজারা দিতে পারছে না। ফলে সরকারের কোষাগারে জমা হচ্ছে ৭ বছর পূর্বে নির্ধারিত রাজস্বই। ফলে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও বৃদ্ধি পায়নি বাঘাবাড়ী নৌ-বন্দর থেকে প্রাপ্ত সরকারী রাজস্ব আয়। সেইসাথে প্রকৃত বাজার মূল্যে বাঘাবাড়ী নৌ-বন্দর ইজারা নিতে ইচ্ছুক একাধিক প্রতিষ্ঠান থাকলেও মামলার স্থগিতাদেশের কারণে তেমন কিছুই করার নেই বলে দাবী সংশ্লিষ্টদের। এ সুযোগে নানা কৌশলে ইজারা প্রদান প্রক্রিয়া বন্ধ রেখে চড়া শুল্ক আদায় ও এক যুগাধিক এ নৌ-বন্দর করায়াত্বে রেখেছে জনতা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেড। সরকারি কোটি কোটি টাকা রাজস্ব প্রাপ্তিতে ছাই ঢালতে জনতা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেডকে একটি কুচক্রী মহল দীর্ঘ সময় মদদ ও সহযোগীতা করে আসছে বলেও নানা অভিযোগ রয়েছে।

জানা গেছে, বিআইডাবিøউটি’র বাঘাবাড়ী নৌ-বন্দরটি উত্তরবঙ্গের গুরুত্বপূর্ণ নৌ-বন্দর। সরকার প্রতি বছর এ নৌ-বন্দরের ইজারা খাত থেকে প্রায় দেড় কোটি টাকা অর্থ রাজস্ব পায়। বাঘাবাড়ী নৌ-বন্দরে রয়েছে  বিপিসি’র পদ্মা, মেঘনা, যমুনার তেল ডিপো। সরকারি সার, তেল, ধান, চাল, কয়লা, পাথর, সিমেন্ট, ক্লিংকারসহ বেসরকারি বিভিন্ন মালামাল এই বন্দর থেকে লোড- আনলোড করে উত্তরবঙ্গের ১৬ টি জেলায় সর্বরাহ করা হয়। এছাড়াও বাঘাবাড়ীতে রয়েছে সারের সরকারি বাফার গুদাম। সরকার এসব খাত থেকে প্রচুর পরিমান রাজস্ব আদায় করে থাকে এবং এ নৌ-বন্দরের উপর নির্ভর করে প্রায় দুই হাজার শ্রমিকের ভাগ্য।

তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৯৫৮ সালে বাংলাদেশ অভ্যন্তরিন নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষ অধ্যাদেশ নং ৭৫ দ্বারা গঠিত এবং সরকারি গেজেট নোটিফিকেশন নং ৪৬৩ এইচটিডি এর মাধ্যমে ১৯৬০ সাল থেকে বন্দর সমূহের সংরক্ষণে নিযুক্ত বাংলাদেশ অভ্যন্তরিন নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষ নির্ধারিত শর্তাবলীর মাধ্যমে ইজারা প্রদান করে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় বন্দর কর্তৃপক্ষ সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে বাঘাবাড়ি নৌ বন্দর ২০১২-২০১৩ অর্থ বছরে জনতা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে ইজারা প্রদান করেন। 

এরপর বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে আরও দুইবার ইজারা পায় প্রতিষ্ঠানটি। সর্বশেষ ২০১৪-১৫ অর্থ বছরে সর্বমোট ১ কোটি ১৪ লাখ টাকার বিনিময়ে ইজারা গ্রহণ করে জনতা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেড। 

এই সময়ের মধ্যে, দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা, হরতাল, অবরোধ, নদীর পাড় শুকিয়ে যাওয়া, নদীর দক্ষিণ পাড়ে নৌ ফায়ার সার্ভিসের বিল্ডিং নির্মানসহ দফায় দফায় বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে মোট ৬১ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দাবী করে জনতা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেড। এদিকে, এসব কারণকে সম্পূর্ণ অযৌক্তিক এবং ভিত্তিহীন উল্লেখ করে সকল আবেদন নাকচ করে দেয় বাংলাদেশ অভ্যন্তরিন নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষ। পরবর্তীতে, এ নৌ-বন্দরের বার্ষিক ইজারা বন্ধে কৌশলে জনতা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেডের পক্ষে প্রতিষ্ঠানটির সাধারণ সম্পাদক মোঃ আব্দুছ ছালাম বাদী হয়ে শাহজাদপুর উপজেলা যুগ্ম জেলা জজ চৌকি আদালতে মামলা (১১৯/২০১৭)  দায়ের করেন। সেই মামলাকেও ভিত্তিহীন, কাল্পনিক উল্লেখ করে আদালতে ২০২০ সালের ১০ নভেম্বর লিখিতভাবে জবাব দেন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের পক্ষে বাঘাবাড়ি বন্দরের তৎকালীন নির্বাহী পরিচালক এস এম সাজ্জাদুর রহমান। 

তিনি জবাবে উল্লেখ করেন, ইজারার চুক্তিতে ১৮ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী স্পষ্ট উল্লেখ আছে কোন নৈসর্গিক কারনে বা হরতাল/ অবরোধ/ ধর্মঘটের কারনে বা ক্ষমতা বহির্ভূত কোন কারনে যদি খালে নৌ চলাচল বা ঘাট পয়েন্টে যাত্রী ও পণ্য উঠানোর কাজ বন্ধ থাকে সে ক্ষেত্রে ইজারা গ্রহিতাকে কোন প্রকার ক্ষতিপূরণ কিংবা ইজারার অর্থ ফেরত দিবে না কর্তৃপক্ষ। এই সমস্ত শর্ত জানার পরও রহস্যজনক কারণে বাদীর পক্ষে মামলা চালিয়ে বছরের পর বছর ইজারা বন্ধ রেখে সরকারকে প্রকৃত রাজস্ব থেকে বঞ্চিত করে  অবৈধ পন্থায় শুল্ক আদায় করে আসছে জনতা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেড নামের প্রতিষ্ঠানটি। ফলে ব্যবসায়ী মহলসহ বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে সরকারি রাজস্ব ঘাটতিতে সম্পৃক্ত জনতা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেডের খুঁটির জোর কোথায়?

এ বিষয়ে বাঘাবাড়ী নৌ-বন্দরের সাবেক ইজারাদার আলতাফ সরকারের জানান, ‘এটি সম্পূর্ণ ভূয়া মামলা। কিছু মানুষকে বিরাট অংকের টাকা দিয়ে ম্যানেজ করে মামলার নামে তামাশা করে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করছে একটি চক্র। মূলত পোর্টের বার্ষিক ইজারা বন্ধ রাখতে কৌশলে যে মামলা করেছে তা রীতিমতো হাস্যকর। কারণ, প্রতি বছরই শুষ্ক মৌসুমে নদীর পাড় শুকিয়ে যায়। এর কারণে নৌ-বন্দরের শুল্ক আদায় তো বন্ধ থাকেনা কখনো।’

বাঘাবাড়ী নৌ-বন্দরের আরেক ব্যবসায়ী আবুল সরকার জানান, ‘মামলায়  হরতাল অবরোধের কারণে ক্ষতির কথা বলা হয়েছে। এটা চরম চতুরতা। কারণ হরতাল, অবরোধে সড়কপথে যান চলাচল বন্ধ থাকালেও নৌযান চলাচল বন্ধ থাকেনি। সেক্ষেত্রে বন্দরে যাত্রী এবং পণ্য পরিবহন দ্বিগুণ বেড়ে যায়। ফলে ক্ষতির কথা বলা হলেও ব্যাপক লাভবান হয় প্রতিষ্ঠানটি। মূলত প্রচুর মুনাফা করার পরও কেবল সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দিতে নিজেদের করায়ত্বে বন্দর কুক্ষিগত করে রেখে লোকসান দেখিয়ে অসৎ উদ্দেশ্যে সম্পূর্ণ কাল্পনিক একটি মামলা দিয়ে এবং হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ করিয়ে বছরের পর বছর ইজারা বন্ধ রেখেছে ছালাম বেপারির জনতা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেড সমিতি।’ 

এদিকে, বাঘাবাড়ি বন্দরের সাবেক নির্বাহী পরিচালক এস এম সাজ্জাদুর রহমানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি সাংবাদিকদের জানান, ‘তিনি আর বাঘাবাড়ি পোর্টে কর্মরত নেই বলে এ বিষয়ে কোন মন্তব্য করতে পারবেন না।’

অন্যদিকে, বাঘাবাড়িতে কর্মরত বন্দর ও পরিবহন কর্মকর্তা মোঃ আসাদুজ্জামানের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, 'মামলাটি যেহেতু আদালতে চলমান রয়েছে তাই এ সম্পর্কে মন্তব্য করা উচিৎ হবে না।' 

বিজ্ঞমহলের মতে, ‘দীর্ঘ ৭ বছর বাঘাবাড়ী নৌ-বন্দরের ইজারা প্রদান বন্ধ থাকায় সরকার কোটি কোটি টাকা রাজস্ব হারিয়েছে। এজন্য অনতিবিলম্বে সকল আইনী জটিলতা নিরসনপূর্বক সরকারি রাজস্ব বৃদ্ধিতে বাঘাবাড়ী নৌ-বন্দরের ইজারা প্রদান অতীব জরুরী হয়ে পড়েছে। সেইসাথে অসাধু উপায়ে দীর্ঘকাল ইজারা বন্ধ রেখে সরকারের রাজস্ব ঘাটতি সৃষ্টির সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাগ্রহণও প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।